অলিম্পিকের আগে কলকাতায় হার্ডলস প্রাকটিস করার অসুবিধা ছিল সেজন্য প্রতিদিন পৌঁছে যেতেন কলকাতা থেকে একটু দূরে। পায়ে রানিং শু,পরনে ছোট প্যান্ট,গায়ে ডোরা কাটা জামা,সমস্ত দেহে যেন শক্তির আভা৷ কোঁকড়া চুলের এই মেয়েটিকে দেখলে মনে হত কোনও গ্রীক ভাস্করের হাতে গড়া পাথরের প্রতিমূর্তি৷
অ্যাথলিট ইস্থার লীলা কে পিছনে ফেলে নীলিমার উত্থান৷ ১৯৪৮থেকে ১৯৫৮, মেয়েদের অ্যাথলেটিক্সে নীলিমা বাংলার সুনাম বৃদ্ধি করেছেন৷ রাশি-রাশি পুরস্কার জিতেছেন৷ জাতীয়-রাজ্য রেকর্ড ভাঙাগড়া করেছেন৷ ছোটবেলায় অ্যাথলেটিক্সে হাতেখড়ি হৃষীকেশ পার্কের ব্যায়াম সঙ্ঘে৷ এরপর পার্ক পেরিয়ে বড় মাঠ৷ ১৯৪৮থেকে সুনাম আহরণ৷
দেশ সদ্য স্বাধীন হয়েছে,ভারতীয় ক্রীড়া মানচিত্রে তখন শুধু ফুটবল, হকি,আর ক্রিকেট৷ পুরুষদের জন্য খেলার পরিসর থাকলেও মহিলাদের খেলাধুলায় বড় প্রাচীর সামাজিক সংস্কার আর ছুৎমার্গ৷ অনেক পরিবারের গৃহস্বামীরা চাইতেন না বাড়ির মেয়েরা বাইরে বের হয়ে খেলাধুলা করুক৷ আক্ষরিক অর্থে মেয়েদের জন্য ক্রীড়া পরিকাঠামো বলে তেমন কিছু ছিল না,যা ছিল সবটা ব্যক্তিগত উদ্যোগ৷ সেই পরিকাঠামোয় দৌড় পটিয়সী হিসেবে নীলিমার জুড়ি ছিল না বললেই চলে৷
অ্যাথলেটিক্সের ক্ষেত্রে সে যেন এক অনবদ্য সৌন্দর্যের ছবি,অফুরন্ত প্রাণশক্তির অধিকারিণী ছিলেন৷
১৯৫১সালে দিল্লীতে প্রথম এশিয়ান গেমসে ভারতের প্রতিনিধিত্ব করেন৷ ১৯৫২সালে মাদ্রাজে জাতীয় অ্যাথলেটিক্সে ৮০মিটার হার্ডলসে প্রথম স্থান অধিকার করে হেলসেঙ্কি অলিম্পিকে ভারতের প্রতিনিধিত্ব করার সুযোগ পেলেন ।হার্ডলসে নীলিমার সময় ছিল ১৩.১সেকেণ্ড৷ হেলসেঙ্কিতে একই ইভেন্টে আরও ভাল সময় হয়েছিল ১২.৯সেকেণ্ড৷ তবু দ্বিতীয় হিটে স্থান হয়েছিল পঞ্চম৷ ১০০মিটার দৌড়েও প্রথম হিটে পঞ্চম,সময় ১৩.৬সেকেণ্ড৷ অবশ্য গর্ববোধ করতে হয় কারণ অলিম্পিকে ৮০মিটার হার্ডলসে নীলিমার ১২.৯সেকেণ্ড ভারতীয় হিসেবে তখনকার শ্রেষ্ঠ কীর্তি৷
বিনা কারণে কি তিনি অনন্যা? ব্যাডমিন্টনে তাঁর কৃতিত্বের স্বাক্ষর সুস্পষ্ট৷ পেয়েছেন রাজ্য ব্যাডমিন্টনে একাধিক প্রতিযোগিতায় বিজয়নীর জয়মাল্য৷ প্রথমে দৌড়ে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন পরে হার্ডলস,জ্যাভেলিন,এমন কি ডিসকাসে নিপুন দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন৷ সত্যি বলতে কি নীলিমা ঘোষ খেলা কে ভালবেসেছিলেন হৃদয় দিয়ে৷ অনলস অনুশীলন,অফুরম্ত অধ্যবসায়,আর বিরামহীন সাধনা তাঁর সাফল্যের সোপান৷
হেলসেঙ্কি অলিম্পিকের আগে কোপেনহেগনের অ্যাথলেটিক্স ক্যাম্প৷ ভারতীয় দলে নীলিমা, কূর্ট-ভিক পশ্চিম-জার্মানীর ফুটবল দলে৷ ক্ষণিকের পরিচয়৷ ১৯৫৬সালের এক শুভলগ্নে কলকাতায় জার্মান কনস্যুলেটে নীলিমার সঙ্গে রেজেস্ট্রি বিয়ে হল কূর্টের৷ বিয়ের পর দু'বছর তিনি কলকাতায় ছিলেন তাঁর কীর্তির স্মৃতি বুকে নিয়ে৷ তারপর দেশ ছেড়েছেন৷ এরপর হামবুর্গে থেকেছেন,সেখানেও তিনি নিয়মিত খেলতেন ব্যাডমিন্টন৷আজ তিনি বিস্মৃতদের দলে৷আমরা কতজন ভারতের হয়ে অলিম্পিকে প্রথম দৌড়ানো মেয়েটির কথা মনে রেখেছি? সেই আমলে নিলীমা ঘোষ প্রমাণ করে দিয়েছিলেন আমরা নারী আমরা সব পারি।