নিজস্ব প্রতিবেদন:
কোচবিহারের মঞ্চ থেকে বাংলা ও রাজবংশী, দুই ভাষাতেই বক্তব্য রেখে উত্তরবঙ্গের জনমানসে সরাসরি পৌঁছনোর চেষ্টা করলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। বক্তব্যের শুরুতেই তিনি রাজবংশী ভাষায় বলেন, “তোমাক সগাকে মোর দন্ডবৎ”, তারপর যোগ করেন, “মুই তোমারে লোক”। সেই মুহূর্তেই স্পষ্ট হয়ে যায়, উত্তরবঙ্গের রাজবংশী সমাজকে রাজনৈতিকভাবে আরও ঘনিষ্ঠ করার কৌশলেই এগোচ্ছে বিজেপি।
প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে বারবার উঠে আসে উত্তরবঙ্গের আলাদা সামাজিক-সাংস্কৃতিক পরিচয়। মঞ্চে উপস্থিত ছিলেন অনন্ত মহারাজ ও বংশীবদন বর্মন, যা রাজনৈতিক দিক থেকে যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। যদিও মোদী তাঁর বক্তব্যে একাধিকবার বাংলাতেও কথা বলেন, তবুও রাজবংশী ভাষার ব্যবহার যে শুধুই সৌজন্য নয়, বরং স্পষ্ট রাজনৈতিক বার্তা, তা নিয়ে জোর আলোচনা শুরু হয়েছে।
সভায় প্রধানমন্ত্রীকে উত্তরবঙ্গের ঐতিহ্যবাহী রাজবংশী বাদ্যযন্ত্র সারিন্দা উপহার দেন ডঃ সুকান্ত মজুমদার। পাশাপাশি তাঁকে উপহার দেওয়া হয় কোচবিহারের কুলদেবতা মদনমোহন বাড়ির প্রতিকৃতি এবং ডুয়ার্সের পোর্ট্রেট। এদিন প্রচলিত ‘হলদিয়া গামছা’ নয়, বরং উত্তরীয় পরিয়ে তাঁকে বরণ করা হয়, যা স্থানীয় সাংস্কৃতিক আবহকে আরও গুরুত্ব দেওয়ার ইঙ্গিত বহন করে।
উত্তরবঙ্গের অর্থনীতি ও কৃষির প্রসঙ্গেও সরব হন প্রধানমন্ত্রী। বিশেষ করে আলু চাষীদের সমস্যা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, এই অঞ্চলে আলুকে ঘিরে চিপস শিল্প গড়ে ওঠার সম্ভাবনা রয়েছে। একইসঙ্গে তিনি আরও বেশি কোল্ড স্টোরেজের প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করেন। কৃষি নির্ভর উত্তরবঙ্গের মানুষের কাছে এই বার্তা যে তাৎপর্যপূর্ণ, তা বলাই বাহুল্য।
স্বাস্থ্য পরিকাঠামো নিয়েও রাজ্য সরকারকে একপ্রকার চাপে ফেলেন মোদী। তিনি বলেন, কালিম্পং, দক্ষিণ দিনাজপুর ও আলিপুরদুয়ার জেলায় এখনও মেডিকেল কলেজ নেই। যদিও তিনি সরাসরি এআইএমএস ধাঁচের একটি বিশ্বমানের হাসপাতালের দাবি তোলেননি, তবুও তাঁর বক্তব্যে উত্তরবঙ্গের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ঘাটতি স্পষ্টভাবে সামনে আসে।
রাজবংশী আবেগে স্পর্শ আনতে মোদী তাঁর বক্তৃতায় পঞ্চানন বর্মা, চিলা রায়-এর পাশাপাশি সত্যেন্দ্রনাথ মজুমদার-এর নামও উচ্চারণ করেন। অর্থাৎ, ইতিহাস, পরিচয় ও সাংস্কৃতিক আত্মমর্যাদাকে সামনে রেখে রাজবংশী সমাজের মন জয়ের চেষ্টা ছিল স্পষ্ট। তবে রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, কোচবিহারের ইতিহাসচর্চার গুরুত্বপূর্ণ নাম খান চৌধুরী আমানতউল্লা আহমেদ-এর মতো ব্যক্তিত্বের উল্লেখ থাকলে স্থানীয় ভূমিপুত্র মুসলিম সমাজের কাছেও আরও ইতিবাচক বার্তা যেতে পারত।
কারণ, সীমান্তবর্তী এই অঞ্চলে ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারী’ এবং স্থানীয় মুসলিম ভূমিপুত্র সমাজ এক নয়। এই দুই পরিচয়কে আলাদা করে দেখা জরুরি বলেই মনে করছেন অনেকে। উল্লেখযোগ্যভাবে, উত্তরবঙ্গের স্থানীয় মুসলিম সমাজের একটি অংশও বর্তমানে বিজেপির সঙ্গে রাজনৈতিকভাবে যুক্ত।
সীমান্ত সুরক্ষা ও চিকেন নেক করিডর নিয়ে বক্তব্য রাখতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী ইটাহার, হাসিমারা-সহ তিনটি বিমানঘাঁটির সম্প্রসারণ প্রসঙ্গও তোলেন। তাঁর অভিযোগ, রাজ্য সরকার জমি অধিগ্রহণে সহযোগিতা না করায় এই গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও কৌশলগত প্রকল্পগুলি এগোচ্ছে না। ফলে উন্নয়ন ও জাতীয় নিরাপত্তা, দুই ইস্যুকেই একসঙ্গে সামনে এনে উত্তরবঙ্গের ভোট রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করলেন তিনি।
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয়, মোদী তাঁর বক্তৃতায় পশ্চিমবঙ্গের ভেতরে থেকেই উত্তরবঙ্গ তথা কোচবিহারের উন্নয়নের কথা বলেছেন। কিন্তু উত্তরবঙ্গকে আলাদা করার দাবি বা ইঙ্গিত সরাসরি দেননি। যদিও রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের একাংশ মনে করছেন, বিজেপির অন্যান্য নেতাদের বক্তব্যে বারবার উত্তরবঙ্গ এবং ‘৫৪-তে ৫৪’ স্লোগানের পুনরাবৃত্তি ভবিষ্যতের বড় রাজনৈতিক সমীকরণের ইঙ্গিত বহন করতে পারে।
অনেকের মতে, দক্ষিণবঙ্গে বিজেপির ফল আশানুরূপ না হলে উত্তরবঙ্গকে কেন্দ্র করেই নতুন রাজনৈতিক বয়ান তৈরি হতে পারে। সেই জল্পনা আরও উসকে দিয়েছে বিজেপির সাম্প্রতিক প্রার্থী বাছাইও। কোচবিহারের রাজবংশী নেতা বংশীবদনের ঘনিষ্ঠ দুই মুখকে ইতিমধ্যেই টিকিট দেওয়া হয়েছে, যা রাজবংশী ভোটব্যাঙ্ককে পাকা করতে বিজেপির পরিকল্পনারই অংশ বলে মনে করা হচ্ছে।
এখন প্রশ্ন একটাই, প্রধানমন্ত্রীর এই ভাষণ উত্তরবঙ্গের রাজবংশী সমাজের মনে কতটা সাড়া ফেলল?
তার উত্তর মিলবে ভোটবাক্সে, আর রাজনৈতিকভাবে তার আসল হিসাব মিটবে চৌঠা মে।